শেখ শামীম, কলমাকান্দা: নেত্রকোনার কলমাকান্দায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে এক নতুন প্রত্যয়ের সূচনা হয়েছে। “আমার উপজেলা আমার দায়িত্ব, শিশুর জীবন হোক বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম মুক্ত”- এই যুগোপযোগী ও সময়োচিত প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে উপজেলাকে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমমুক্ত ঘোষণা করার লক্ষ্যে বিশেষ অঙ্গীকার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে উপজেলা প্রশাসন ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সার্বিক তত্ত্বাবধানে জেলা পরিষদের অডিটোরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হল রুমে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কলমাকান্দার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাজল আলফন্স দ্রং।
সভার শুরুতে এ কর্মসূচির সার্বিক কার্যক্রম, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সমন্বয়ক (পক্ষ সমর্থন ও শিশু সুরক্ষা-এনবিসি ক্লাস্টার) ফেরদৗসী আলম।
জুলিয়ানা হীরা ও মবিন উদ্দিনের চমৎকার ও যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মতবিনিময় ও ঘোষণা সভায় আরও বক্তব্য দেন, লেংঙ্গুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাইদুর রহমান ভূইয়া, কলমাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিদ্দিক হোসেন, প্রেসক্লাব সভাপতি শেখ শামীম, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরে আলম এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জান্নাতুল ইসলাম মিম।
এছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, কাজী ফজলুল হক, অভিভাবক নার্গিস আক্তার, শিশু প্রতিনিধি রেদুয়ান মিয়া, সাহসী কন্যা কোহিনূর আক্তার এবং মাঠকর্মী হৃদয় পাল। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরাও এসময় উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা তাদের আলোচনায় শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে কথা বলেন। তারা বলেন, “একটি শিশুর হাতে বই থাকার কথা, সেখানে শ্রমের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে যে বয়সে একটি শিশুর স্বপ্ন দেখার কথা, খেলাধুলা করার কথা, সে বয়সে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি তার ভবিষ্যৎকে চিরতরে অন্ধকার করে দেয়।”
তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম নির্মূলে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ বা প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়—এ জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় নেতৃত্ব একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে একটি মানবিক, নিরাপদ ও শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে তোলা নিশ্চিতভাবেই সম্ভব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সুধীজনরা কলমাকান্দাকে সম্পূর্ণভাবে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সকলের সম্মিলিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুন্দর, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
অংশগ্রহণকারীরা এ আয়োজনকে শুধুমাত্র একটি প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না, বরং তারা একে একটি বৃহত্তর মানবিক আন্দোলনের সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন- যা আগামী দিনে কলমাকান্দার সামাজিক পরিবর্তনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
