শেখ শামীম, কলমাকান্দা: হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর নীরব করিডোরের মাঝে রচিত হলো অনন্য এক মানবিকতার গল্প। একদিকে সন্তানের জীবন বাঁচাতে এক মায়ের নিজের কিডনি দানের মতো সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, অন্যদিকে একজন জনপ্রতিনিধির নিঃস্বার্থ আর্থিক ও মানসিক সহায়তা- এই দুইয়ে মিলে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার যুবক কৃষ্ণ হাজং।
বুধবার (২৫ মার্চ) দীর্ঘ চিকিৎসার পর সফল কিডনি প্রতিস্থাপন শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষ্ণ হাজং।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষ্ণ হাজং ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবা, মা, স্ত্রী ও এক কন্যাকে নিয়ে ছিল তার অভাবের সংসার। হঠাৎ করেই জানতে পারেন তার দুটি কিডনিই সম্পূর্ণ অকেজো। প্রথমে ময়মনসিংহ এবং পরে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে গিয়ে কৃষ্ণের পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অর্থাভাবে ডায়ালাইসিস করাতে না পেরে গত বছরের মে মাসের শেষদিকে একপ্রকার মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি।
অসহায় কৃষ্ণের নিভু নিভু জীবনের কথা জানতে পারেন তৎকালীন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পদক এবং বর্তমানে নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য, ডেপুটি স্পিকার ও সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে তিনি নিজ উদ্যোগে অসহায় এই মানুষটির চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে গত ১৮ জুন থেকে ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) কৃষ্ণের নতুন করে চিকিৎসা ও ডায়ালাইসিস শুরু হয়।
চিকিৎসকরা জানান, কৃষ্ণকে বাঁচাতে হলে কিডনি প্রতিস্থাপন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ছেলের করুণ পরিণতি মেনে নিতে পারেননি তার গর্ভধারিণী মা। নিজের জীবনের ঝুঁকি তুচ্ছ করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার একটি কিডনি সন্তানকে দান করবেন।
টানা আট মাস চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ২ মার্চ পিজি হাসপাতালে কৃষ্ণের কিডনি প্রতিস্থাপনের দিন ধার্য হয়। দীর্ঘ সময়ের জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পুরো এই প্রক্রিয়ার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন ও সার্বক্ষণিক তদারকি করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অবশেষে আজ (বুধবার) হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান কৃষ্ণ হাজং। আনন্দঘন ও আবেগাপ্লুত মুহূর্তে হাসপাতালে ছুটে যান ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। এসময় কৃষ্ণের মা দুহাত তুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে মানবিক নেতাকে আশীর্বাদ করছেন এবং ডেপুটি স্পিকার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাদের বিদায় জানাচ্ছেন।
দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে এবং মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “মানবিক দায়বদ্ধতা থেকেই আমি কৃষ্ণ হাজংয়ের পাশে দাঁড়িয়েছি। সবসময় তার চিকিৎসার অগ্রগতির সার্বিক খোঁজ-খবর নিয়েছি। সব কিছু ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সবার কাছে অনুরোধ, আসুন আমরা প্রার্থনা করি, কৃষ্ণ হাজং সুস্থ থেকে তার পরিবারের হাল ধরতে পারেন।”
একজন মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং একজন নেতার এমন মানবিক উদ্যোগ কেবল একটি পরিবারের ভাগ্যই বদলায়নি, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সহমর্মিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।


