নিজস্ব প্রতিবেদক: চারপাশে আর দশটা সাধারণ বাজারের মতোই কোলাহল। রিকশা-ভ্যানের টুংটাং শব্দ, ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি। এরই মাঝে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শিবগঞ্জ বাজারের একটি হার্ডওয়্যার ও রঙের দোকানে প্রতিদিন দেখা যায় এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। দোকানের ক্যাশবক্সে বসে অত্যন্ত দক্ষ হাতে হিসাব-নিকাশ এবং ক্রেতাদের সামলাচ্ছেন এক নারী। এক হাতে ব্যবসার গুরুদায়িত্ব, অন্য হাতে সংসারের হাল- সব মিলিয়ে জীবনের সব বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা এক সাহসী নারীর নাম কবিতা দত্ত।
গত ১৮ বছর ধরে তিনি শিবগঞ্জ বাজারের ‘মেসার্স দত্ত ট্রেডার্স’ এর স্বত্বাধিকারী হিসেবে জীবনযুদ্ধের ময়দানে লড়াই করে চলেছেন। এটি শুধু একজন নারীর ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার গল্প নয়, এটি একজন মায়ের তার সন্তানদের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার এক অনন্য অনুপ্রেরণার আখ্যান।
২০০১ সালে স্বামী গোবিন্দ দত্ত শিবগঞ্জ বাজারে ‘মেসার্স দত্ত ট্রেডার্স’ নামে ব্যবসাটি শুরু করেছিলেন। সংসার, সন্তান আর ব্যবসা নিয়ে স্বাভাবিক ও সুন্দর একটি জীবনই পার করছিলেন তারা। কিন্তু ২০০৮ সালে হঠাৎ করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গোবিন্দ দত্ত। মুহূর্তের মধ্যেই কবিতা দত্তের জীবনের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যায়। তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে তিনি যেন এক অথৈ সাগরে এসে পড়েন।
স্বামীর মৃত্যুর পর ব্যবসার কিছুই বুঝতেন না কবিতা। হার্ডওয়্যার ব্যবসার মতো একটি সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক এবং পরিশ্রমের জগতে তার কোনো ধারণাই ছিল না। চারপাশের অনেকেই তখন ভেবেছিল, এই দোকান হয়তো আর টিকবে না। স্বজনদের কটু কথা আর নানা প্রতিবন্ধকতাও ছিল। কিন্তু, কবিতা দত্ত হার মানেননি।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “ব্যবসা সম্বন্ধে আমার কোনো কিছুই জানা ছিল না। তবে আমার মনে এমন একটা জেদ জন্মাইছিল যে, স্বামীর হাতে গড়া ব্যবসাকে আমার দাঁড় করাইতে হবে। আমার বাচ্চাদের মানুষ করতে হবে। অন্যের হাতের দিকে তাকাবো কেন? যেহেতু আমি একটু পড়াশোনা জানি, তাই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম।”
প্রাথমিক অবস্থায় দোকানে বসাটা সহজ ছিল না। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অনেক নেতিবাচক কথার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাকে। তবে কঠিন সময়ে তিনি একা ছিলেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে দোকানের মনিন্দ্র চন্দ্র দাস নামে এক বিশ্বস্ত সহযোগী তার পাশে ছিলেন।
ওই সহযোগী বলেন, “দোকান টিকবে না- এমন কথা অনেকেই বলেছিল। কিন্তু, উনি আর আমি মিলে চ্যালেঞ্জ নিলাম যে দোকান আমরা টিকিয়ে রাখব।” এই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় স্থানীয় মহাজন এবং বাজারের অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও তাকে সহযোগিতা করেছেন। সবার সম্মিলিত সহযোগিতায় কবিতা দত্ত ধীরে ধীরে ব্যবসার খুঁটিনাটি শিখে নেন এবং শক্ত হাতে এর হাল ধরেন।
কবিতা দত্তের দীর্ঘ সংগ্রামের মূল লক্ষ্যই ছিল তার তিন সন্তান। আজ তার সন্তানেরা প্রতিষ্ঠিত। ছোট মেয়ে জয়াবতীর বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখন সে তার বাবাকে হারায়।
মায়ের এমনি সংগ্রাম সম্পর্কে জয়াবতী বলেন, “আমার পরিবারের সব দায়িত্ব আমার মায়ের কাছেই। বাবার আদর, মায়ের আদর- দুটোই আমি আমার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি।” বাবার অনুপস্থিতি বুঝতে না দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলাই কবিতা দত্তের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
এক সময়ের সেই দিশেহারা নারী আজ শিবগঞ্জ বাজারের পরিচিত ও সফল বড় ব্যবসায়ীদের একজন। নিজের অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী কবিতা দত্ত বলেন, “এখন মোটামুটি আমি সফল। বাজারের দশজন সফল ব্যবসায়ী থাকলে, তার ভেতরে আমি একজন।”
প্রতিটি বাধাকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে অদম্য পরিশ্রম, দৃঢ় মনোবল আর সাহসের ওপর ভর করে কবিতা দত্ত আজ শুধু একজন ব্যবসায়ী নন, বরং সমাজের সব নারীর জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ইচ্ছেশক্তি আর জেদ থাকলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকেই সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।
