শাকিল বাবু, নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. বাকীবিল্লাহ (সাকার মুস্তাফা)-এর নিয়োগের বিষয়ে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ পেয়ে দশ বছর ধরে ফোকলোর বিভাগে শিক্ষতা করছেন তিনি। মো. বাকীবিল্লাহ-এর নিয়োগপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৭ অক্টোবর ২০১৫ তারিখের একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং ২০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখের নিয়োগ বাছাই কমিটির সুপারিশক্রমে তাকে ফোকলোর বিভাগের প্রভাষক (সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নিয়োগের পূর্বে সংশ্লিষ্ট পদের জন্য জাতীয় কোনো দৈনিকে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি (Circular) প্রকাশ করা হয়নি। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার কথা। কিন্তু মো. বাকীবিল্লাহর ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি তার ব্যক্তিগত আবেদনের প্রেক্ষিতেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। গত ১২ মে ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হাতে এসেছে।
সেখানে ফোকলোর বিভাগের প্রভাষক-০১ টি পদের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছে। আর এই বিজ্ঞপ্তির প্রেক্ষিতে আবেদনের ভিত্তিতে অন্য একজন শিক্ষককে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এমন ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগের বিষয়ে ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক মো. বাকীবিল্লাহ-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি অন্য ক্যান্ডিডেটের উপর দোষ চাপিয়ে বলেন, “এরকম কোনো বিষয় হয় নাই আমি যতটুকু জানি।
যে ক্যান্ডিডেটের সাথে নিয়োগ হয়েছে তার সাথে আমার ফার ফার ডিফেরেন্স। এগুলো নিয়োগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় বডি। এজন্য রেজিস্ট্রার মহোদয় আছেন বা অন্য যারা আছেন তাদের সাথে কথা বলেন। আমাদের দুজনের একই সার্কুলারে নিয়োগ হয়েছে।” এক সার্কুলারে এক পদে দুজনকে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটাতো আমি বলতে পারবো না। আমাকে কোন পদে নিল তাকে কোন পদে নিল। এগুলোতো বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারবে।
এধরণের সার্কুলার হয়, সার্কুলারের পর নিয়োগ হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেতো কোনো প্রার্থী কানেক্টেড থাকেনা।” এবিষয়ে নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুব হোসেন-এর সাথে কথা বলে ঘটনার সত্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “অনেক আগের সার্কুলারতো। কাগজপত্র যখন ছিল তখন আমরা দেখেই দিয়েছি। তবে একটা নিয়োগ বোর্ডের মূল যিনি থাকেন, তিনি হলেন নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি। সেক্ষেত্রেতো সভাপতিই সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে আমরা ইন্টার্নাল কমিটি ছিলাম সেখানে বহিঃস্থ সদস্য ছিলেন।
এই পুরো বিষয়টাই একটা কমিটির সভাপতিত্বে হয়। এই বিষয়টার এখতিয়ারটা আসলে সভাপতির। তবে একপাক্ষিকভাবে সভাপতিকেই দায়ী করছিনা। অনেক আগের যেহেতু হতে পারে সেটা সুস্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছেনা।” বিজ্ঞপ্তি ছাড়া এই নিয়োগের বিষয়ে নিয়োগ বাছাই কমিটির সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহীত উল আলম বলেন, “ঐগুলা আমার কিচ্ছু মনে নাই। সিন্ডিকেট-টিন্ডিকেট আছে, পেপার-টেপার আছে ওগুলো দেখো।
আমাদের কমিটির সব সিদ্ধান্ত রেজিস্ট্রার অফিসেই আছে।” এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বরত বর্তমান রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, “কোনো পদের জন্য ইউজিসির অনুমোদনের ভিত্তিতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা হয়। তবে এর বাহিরে যদি কিছু ঘটে থাকে তাহলে সেটা বৈধতার মধ্যে পড়ে না।” বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)-এর নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি পদের বিপরীতে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া বাধ্যতামূলক। বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ পাওয়াকে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা ‘পিছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ’ হিসেবে দেখছেন।
যোগ্য শত শত প্রার্থী যখন একটি চাকরির জন্য অপেক্ষায় থাকেন, সেখানে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই একজন ব্যক্তির আবেদনে নিয়োগ হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন-এর সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা অসম্ভব ব্যাপার। নিয়মটা হচ্ছে সহযোগী অধ্যাপকের বিপরীতে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হলেও দুইবার বিজ্ঞাপন দিতে হবে।
দুইবার বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরে যদি ক্যান্ডিডেট না পায় তখন নতুন করে প্রভাষকের বিজ্ঞাপন দিতে হবে। বিজ্ঞাপন না দেওয়া হলে নিয়োগটা বৈধ হয়নি।” এদিকে তার নিয়োগের জন্য আবেদনপত্র জমাদানের তারিখের ক্ষেত্রেও গরমিল পাওয়া যায়। সার্কুলারে ১৫ জুন ২০১৫ তারিখ বিকাল ৫.০০ টার মধ্যে জমা দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে মো. বাকীবিল্লাহ-এর নিয়োগপত্রে ১৭ অক্টোবর ২০১৫ তারিখ আবেদনের তারিখ হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়।


