26 C
Dhaka
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৩

এসো হে বৈশাখ

যা যা মিস করেছেন

মোঃ আব্দুল মান্নান মল্লিক, কলাম লেখক, দ্যা মেইল বিডি ডট কম

দরজায় কড়া নাড়ছে নতুন বছর। আসছে পয়লা বৈশাখ। আজ বুধবার সূর্য অস্ত যাবার সাথে সাথে চৈত্র সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বিদায় নিবে ১৪২২ বঙ্গাব্দ। বৃহস্পতিবার ভোরের সূর্যদয়ের মধ্য দিয়ে আসবে নতুন ১৪২৩ বঙ্গাব্দ। আজ থেকে সারা বাংলাদেশেই শুরু হয়ে গেছে নতুন বছরকে বরনের নিমিত্তে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি।

pohela boishakh the mail bd

বাংলার আবহমান সংস্কৃতির লালিত ঐতিহ্য-আদর্শ সামনে রেখে নতুন বছরে সব ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাকে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে আগামীকাল মহোৎসবে সর্বস্তরের জনসাধারণ পালন করবে বাংলা নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ বাংলার ঐতিহ্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। বাংলাদেশের আপামর জনগণের নববর্ষকে পালন করার দৃশ্য দেখে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই আনন্দের মহামিলনে যোগ দেয়। ভুলে যায় অতিতের সকল হিংসা, বিদ্বেশ ও ভেদাভেদ।

পয়লা বৈশাখ। জাতি, ধর্ম-বর্ণ নিরর্বিশেষে সবাই প্রাণের উচ্ছাসে মাতে এদিনে। কবি সাহিত্যিকগণও বৈশাখ বিষয়ে আন্দোলিত হন। তারা গদ্যে ও কাব্যে বৈশাখের প্রতি ভালোবাসা নিবেদন করেন। ধ্বংস-সৃষ্টি, বিরহ-মিলন, সুখ-দুঃখ, প্রাপ্তী-অপ্রাপ্তি সব কিছু উঠে আসে শিল্পীদের বিভিন্ন প্রকার শিল্পের বাঁকে বাঁকে। সাহিত্যে বৈশাখের পদচারণা ব্যাপক। বৈশাখের পটভূমি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি। ঋতুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সহজেই সাহিত্যিকদের আন্দোলিত করে, বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে অনুপ্রেরণা জোগায়। সম্রাট আকবরের সময় খাজনা আদায়ের মাস বৈশাখ থেকে শুরু হলেও বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে প্রাণের মেলার উৎসবে পরিণত হয়েছে। কবি সাহিত্যিকগণ প্রাণের মেলার এ উৎসবকে শব্দে ধরে রাখতে বার বার প্রয়াসী হয়েছেন। বৈশাখকে নিয়ে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ছন্দময় কবিতা লিখেছেন এভাবে-

“বৈশাখে অনলসম বসন্তের খরা।
তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা
পায় পোড়ে খরতর রবির কিরণ।”

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন লেখা লিখেছেন। বৈশাখের বারতা তাঁর কবিতায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ নিমগ্নভাবে বৈশাখ বন্দনা করেছে তার বিভিন্ন লেখায়। একদিকে বৈশাখের ধ্বংস্বরূপ, পাশাপাশি নতুন বছরের আগমন সৃষ্টিকে নতুন রূপে উৎসাহিত ও অনুপ্রানিত করে, এমন সত্য তিনি ফুটে তুলেছেন তাঁর “বৈশাখ আবাহন” কবিতায়-

“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি
অশ্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক
মুছে যাক সব গ্লানি। মুছে যাক জরা
অগ্নিবাণে দেহে-প্রাণে শুচি হোক ধরা।”

বৈশাখের মতোই রুদ্র, অশান্ত, বিপ্লবী, বিদ্রোহী ক্ষণজন্মা কবি কাজি নজরুল ইসলাম। বৈশাখের আগমনে মুক্তির উল্লাসে কবি মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন। নতুনের আহ্বান ও সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কবি উদ্দীপ্ত হন। কাব্যিক ব্যঞ্জনার মাধ্যমে দৃপ্তকন্ঠে তিনি উচ্চারণ করেন-

“ঐ নতুনের কেতন উড়ে কাল বৈশাখীর ঝড়
তোরা সব জয় ধ্বনি কর
তোরা সব জয় ধ্বনি কর
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর
প্রলয় নতুন সৃজন বেদন
আসছে নবীন জীবন ধারা অসুন্দরে করতে ছেদন।”

এমনিভাবে বৈশাখ নিযে বহু কবি সাহিত্যিকগণ বিভিন্ লেখায় ও কবিতায় তাদের একান্ত মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। চমৎকারভাবে সাবলীল ভঙ্গিতে তাঁরা বিভিন্নভাবে বৈশাখের জয়গান গেয়েছেন। এর মাধ্যমে কবি সাহিত্যিকগণ তাদের লেখায়, কবিতায় বৈশাখের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। নববর্ষের এই চেতনা সমগ্র জাতি সত্তাকে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগাবে।

কবি সাহিত্যিকদের মত আপামর জনসাধারণও বাংলা বর্ষবরণের উৎসব মহানন্দে পালন করে থাকে। বাংলা সনের প্রথম দিনকে আমরা মহা উৎসবে পালন করলেও বাকি দিনগুলোর কথা আমরা ভুলেও আর কখনও স্মরণ করিনা। বাংলা তারিখের হিসাব তো দূরের কথা, বাংলা মাসের নামটিও আমরা অনেকে মনে রাখিনা বা মনে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনা। সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্বশাসীত প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালতসহ সকল প্রতিষ্ঠানে বাংলা তারিখ ও ভাষার ব্যবহার দিনে দিনে বাড়ার পরিবর্তে আরো কমছে। তাই সরকারী, আধা-সরকারী, স্বায়ত্বশাসীত সকল প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা তারিখ ও ভাষার ব্যবহার সর্বাগ্রে এখনই শুরু করা উচিৎ।

বৈশাখ এলেই শহর-গ্রাম-গঞ্জ বৈশাখি গানে উৎসব মূখর হয়ে উঠে। বর্নিল রঙে রাঙা হয় এই ধরণী। অন্যান্য উৎসবের চাইতে একটু আলাদা রঙ-ঢংয়ে পালিত হয় এই দিনটি। কৃষক, কামার, কুমোর, তাঁতি, জেলে থেকে শুরু করে সকল স্তরের মানুষই ব্যস্ত থাকেন এই দিবসটিকে সামনে রেখে। বর্ষ বরণের মূল অনুষ্ঠানটি রাজধানির বটমূলে কাল বৃহস্পতিবার নতুন বছরকে বরণ করবে ছায়ানট। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন।

গত পয়লা বৈশাখে যৌন সন্ত্রাস চালিয়ে নববর্ষ উৎসবকে কুলুষিত করেছিল গুটি কয়েক কুলাঙ্গার। আরেকটি পয়লা বৈশাখ এসে গেলেও তাদের এখনও ধরতে পারেনি আমাদের আইন-শৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এব্যাপারে প্রাচ্যের অক্সফোড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ছিল নির্লিপ্ত ও প্রায় নিশ্চুপ। দেশে কিছু ঘটলে সিসিটিভি ক্যামেরা কেনার ধূম পড়ে যায়। পয়লা বৈশাখের সেই অপ্রিতিকর যৌন সন্ত্রাস কবলীত এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। সেই সকল সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজে দুবৃত্তরা সনাক্ত হবার পরও তারা আজও রয়ে গেছে সকল প্রকার ধরা-ছোঁয়ার অনেক বাইরে। তৎকালীন সময়ে এ ব্যাপারে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে অনেক ভিঢিও ফুটেজও দেখা গেছে ফেসবুকসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিকস গণমাধ্যমে কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই সকল সন্ত্রাসীকে পাকড়াও করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়নি। এবারের পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অনুরূপ ঘটনা ঘটবেনা তার গ্যারান্টি কে দেবে? যদিও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কিছু সংগঠন গত পয়লা বৈশাখের মত কোন ঘটনার পূনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে লক্ষ্যে এবার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে রাজধানীর বটমূল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসহ সারা দেশে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বহিনী। পয়লা বৈশাখে বিকেল ৫ টার পর উন্মূক্ত স্থানে কোন অনুষ্ঠান করা যাবে না বলে ঢাকা মহানগর পুলিশ এক অধ্যাদেশ জারি করেছে। প্রচন্ড দাবদাহে ঘরের বাইরে কোথাও দুদন্ড দাঁড়োনোর এবং এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ানোর উপায় নেই। বিকেলে ও সন্ধায় কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করা তো দূরের কথা বিকেল ৫ টার পর কোন উন্মূক্ত স্থানে অনুষ্ঠান না থাকায় পয়লা বৈশাখে রাজধানীর বাসিন্দারা হয়তো দল বেঁধে সময় কাটাবেন রেস্তোরাঁয়। এমন ভাবনা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁগুলো সেজেছে বৈশাখী সাজে। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে হোটেল কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করেছে মুখরোচক খাবারের। বাংলা নববর্ষকে ঘিরে কেনা-কাটার উৎসব চলেছে বেশুমার।

“নারীর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ আন্দোলন” পয়লা বৈশাখে নগরীর ২২ টি স্থান থেকে নারীদের নিরাপত্তা দেবে। গত মঙ্গলবার জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে এই ঘোষণা দেয়া হয় “নারীর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ আন্দোলন” সংগঠনের পক্ষ থেকে। কোন নারী নিপীড়নের শিকার হলে নারীদের ০১৭৬৮-০৮০৫১৩ ও ০১৫১৬-৯৬৯৩০৩ এ দু’টি নাম্বারে সংগে সংগে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। র‌্যাবের সহযোগীতা পেতে রমনা পার্কে র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ০১৭৭৭-৭১০৩০৩ নাম্বারে যোগাযোগ করার জন্য র‌্যাবের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। দেখা যাক এবার পয়লা বৈশাখ নির্বিঘ্ন হয় কিনা।

More articles

সর্বশেষ

২ কেজি গাঁজাসহ আটক ২