“অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান”

0
514

ডঃ রাহেনা বেগম, কলাম লেখক. দ্যা মেইল বিডি ডট কম।

৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের International Theme “Planet 50-50 by 2030: Step It up for Gender Equality.” আর আমাদের দেশের এবারের ঞযবসব “অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান”।

nari dibosh the mail bd

নারীর ক্ষমতায়ন বলতে আমরা বুঝি নারীকে তার “Power and authority” দেয়া। “Women’s empowerment” denotes that women can fully enjoy the same rights as men. অর্থাৎ নারীরা ঠিক সেই অধিকারই উপভোগ করবে যা একজন পুরুষ উপভোগ করে থাকে।

বাংলাদেশ এমডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ এবং জাতীয় নারী উন্নয়র নীতি ২০১১ সহ জেন্ডারবান্ধব আইন প্রণয়ন ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে।

১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় সংসদের ৫০টি মহিলা আসন, সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে ১০% নারীর জন্য সংরক্ষিত, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পশ্চিম আফ্রিকার আইভরিকোষ্টে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে নারী কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবে যোগ দিলেন কর্নেল ডা: নাজমা বেগম। কর্নেল ডা: নাজমা বেগম সেনাবাহিনীর ইতিহাসে প্রথম নারী কমান্ডার।

নারীরা এখন শুধু ঘরেই আবদ্ধ নয়, সব পেশাতেই আমরা নারীদেরকে দেখতে পাই। নারীরা আজকাল সব কিছুতেই এগিয়ে আছে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আজ নারী-পুরুষ সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একযোগে কাজ করছে। অবশ্য এর ব্যতিক্রম ও আছে।

এতসত্ত্বেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং সঠিক সুযোগের অভাবে আমাদের দেশের নারীদের পরিপূর্ণ ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে পুরুষের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অনেক কম। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় নারীরা ধর্ষণ, সামাজিকভাবে লাঞ্চনার ও বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। ২০১৫ সালের আইন ও শালিস কেন্দ্র এর তথ্যানুযায়ী, যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২২৪ জন নারী, ৮৪৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭০৭ জন। কন্যাশিশুদের নিয়ে আমাদের দেশের পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, যার কারণে দেশের ৬৬ শতাংশই কন্যাশিশুকেই ১৮ বছরের আগে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়।

আমি পেশায় একজন কাউন্সেলর। সেই সুবাদেই আমার আজকের এই লেখা। মৃৃদুলা (ছদ্ম নাম), মৃদুলার সংগে আমার সরকারী একটা শেল্টার হোমে দেখা। প্রথমে আমি ওকে দেখে অবাক হয়ে যাই, অবাক হওয়ার কারণও যথেষ্ট ছিল। শেণ্টার হোমটা ছিল নারী ও শিশুদের। ৮ বছরের উপরের ছেলে শিশুদের ঐ শেল্টার হোমে রাখা হয় না। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ১৬/১৭ বছরের এক কিশোর বালক, পরনে জিন্সের প্যান্ট, গ্রামীণ চেকের শার্ট, পায়ে কেডস্, ছেলেদের মত ছোট করে ছাটা চুল, চোখ ফেরানো যায় না, এত সুন্দর! তাকে বসতে বল্লাম, নাম জানতে চাইলাম। সে তার নাম বল্লো। ভালো করে দেখলাম, আসলেইতো সে একজন কিশোরী। প্রাথমিক সৌজন্যতার পরে জানতে চাইলাম এখানে আসার কারণ। সে উত্তর দিলো-“প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই, সে জন্য আমার এখানে আসা।”

তার নির্দোষ চাওয়া। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে সে চাইতেই পারে। আমি প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার কারণ জানার জন্য অপেক্ষা করছি। ইতোমধ্যে সে নিজে থেকেই উত্তর দিলো “আপা আমি ছেলে হতে চাই।” আমি প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম। পরক্ষনে সে আরও বল্লো “আমি খোঁজ নিয়েছি এর জন্য আমার একটা অপারেশনের প্রয়োজন, যার জন্য চার লক্ষ টাকা লাগবে। আমি গরীব এত টাকা কোথায় পাবো? এই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো গরীবদের অনেক সাহায্য করে থাকেন। তিনি কি আমার চিকিৎসার এই ব্যায়ভার বহন করে আমাকে সাহায্য করবেন না?”

তাকে আমার সীমাবদ্ধতাগুলো জানালাম। আমি তাকে বল্লাম যে, তুমি যদি আমাকে অনুমতি দাও তাহলে আমি এখানকার উচ্চপদস্ত আপাদের কাছে তোমার ইচ্ছাটা জানাতে পারি। এরপর জানতে চাইলাম-ছেলে হতে চাওয়ার জন্য বিশেষ কোন কারণ আছে কি? সে উত্তর দিলো না। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, তার প্রিয়ড হয় কিনা? সে জানালো যে তার নিয়মিত প্রিয়ড হয়। সে একজন স্বাভাবিক কিশোরী, তার মধ্যে কোন অস্বাভাবিকতা নেই।

তার সংঙ্গে আমার বেশ কয়েকটা সেশন হয়। “Rapport build up” সেশনের পরে সে জানায়, খুব ছোটবেলায় তার মা তাকে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যায়, তার মা ছিল তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী। সৎ মা তাকে সহ্য করতে পারতো না। তাই তার বাবা তাকে নিয়ে দূরে ইটের ভাটার কাছে একটা খুপরী ঘরে থাকতো। সেখানেই সে খুব ছোটবেলায় প্রথম তার নিজের বাবার দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এতবছর সে তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের, লজ্জার ভয়ের ঘটনা সবার কাছ থেকে খুব সযতনে গোপন করে রেখেছিল। এর পর থেকে মৃদুলা তার নিজেস্ব আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে নিজেকে সে তাকে ছেলেদের মত করে রাখে। সে ভেবেছিল ছেলেদের মতো বেশ-ভূষা তাকে বিকৃত মানসিকতার পুরুষগুলোর হাত থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু তার পরেও সে সৎ বোনের স্বামী, যে বাড়ীতে তাকে তার বাবা কাজ করতে দিয়েছিলো সেই বাড়ীর মামা ও খালুর দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। সে নিজেকে কোন জায়গায়, কোন ভাবেই রক্ষা করতে পারে নাই। তখন থেকেই সে নিজেকে পরুষ ভাবতে শুরু করে এবং কিভাবে পুরুষ হওয়া যায় তার খোঁজ খবর নেয়া শুরু করে।

মৃদুলার মনে হয়েছে যে, এই সমাজ শুধু পুরুষের জন্য, পুরুষরাই এ সমাজে সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী। পুরুষের সাথে একজন নারী কিছুতেই পারবেনা। তাই সে একজন পুরুষ হতে চায়। পুরুষ হয়ে সে তার মতো অসহায় নারীদের জন্য ভবিষ্যতে কিছু করতে চায় ।

এ সমাজের মানুষরা কি মৃদুলার কথা একটু ভাববেন? এ তো গেল একজন মৃদুলার কথা। বাংলাদেশে এ রকম অনেক অনেক মৃদুলা আছে। যাদের খোঁজ-খবর আমরা কেউ জানিনা বা জানতেও চাইনা।

২০৩০ সালের মধ্যে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে নারীদের পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ এবং উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসাবে তাদেরকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে। এই সুযোগ পেলে তখন আর কোন মৃদুলাকে পুরুষ হবার কথা চিন্তা করতে হবে না ইন্শা আল্লাহ্।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here