মানুষের জন্য সুন্দর করে গড়ে তুলতে হবে এই পৃথিবী

0
2886

আব্দুল মান্নান মল্লিক, কলাম লেখক, দ্যা মেইল বিডি ডট কম।

বাংলাদেশের সর্বত্রই আশংকাজনকভাবে শিশু-কিশোর শ্রমবৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকে এদেশের কর্মজীবি শিশু- কিশোরের সংখ্যা শুনলে রীতিমত আঁতকে উঠতে হয়। কম করে ৮০ থেকে ৯০ লাখ শিশু-কিশোর বিভিন্ন ধরনের কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

child labour the mail bd

দেশের ৩ কোটি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে প্রায় ১ কোটিই শিশু-কিশোর। এই শিশু-কিশোররাই উদয়াস্ত পরিশ্রম করে, তথা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কোন মতে পেট চালায় এবং তার সাথে সাথে বাবা-মায়ের অভাব অনটনের সংসারে কিছুটা হলেও তাদের উপার্জিত অর্থ স্বচ্ছলতা আনয়নে সাহায্য করে থাকে। এরা কেউ শিল্প-কারখানা ও ওয়ার্কশপ, বাস, ট্রাক, ট্যাম্পো, মোটর গ্যারেজ, রাজমিস্ত্রী ও কাঠমিস্ত্রী হেলপার, কেউ রিক্সা ও ঠেলা গাড়ী চালায়, কেউ হোটেল, রেস্তোরা ও চায়ের দোকানের বয়, কেউ বাসায় থালা-বাসন ধোয়া-মোছা ও ঝি-চাকর, কেউ কাঁচা বাজারের মিনতি, কেউবা আবার মাথায় খাবার ভর্তি টিফিন কেরিয়ার নিয়ে অফিসে অফিসে খাবার পৌঁছে দেয়। কেউ ইট ভাঙ্গে, কেউ বা গ্রাম এলাকায় রাখাল ও মাঠে কৃষি কাজে কামলা হিসেবে এই শিশু-কিশোরা কর্মরত আছে।

আবার কেউ বাদাম, চানাচুর, পাঁপড়, চকলেট, ঝালমুুড়ি, আইসক্রিম বিক্রেতা, পত্রিকার হকার স্টেশন-টার্মিনালে জুতা পালিশ ও কুলি মুটে হিসেবে শত শত শিশু-কিশোর অবিরাম শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। এদের বয়স সাধারণতঃ ৬ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। এমনি বিচিত্র ধরনের কাজ করে এসব ভাগ্য বিড়ম্বিত শিশু-কিশোর। তাদের স্কুলে যাওয়ার সময় নেই বা খেলার সুযোগ নেই।

যে বয়সে তাদের বয়সী ছেলে-মেয়েরা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যায় কিংবা রং তুলি বা রং পেন্সিল নিয়ে যায় ছবি আঁকতে কিংবা দল বেঁধে খেলার মাঠে ছুটে যায়, সেই বয়সে তাদের রাস্তার পাশে বসে ভাংতে হয় ইট, বাসায় বাসায় করতে হয় থালা-বাসন মাজা কিংবা ঘর মোছার কাজ। এদের একটি ছোট অংশ হলো টোকাই।

সমাজ জীবনও এদের দেয়নি সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। জন্মের পর থেকে ক্ষুধা, দারিদ্রতা, আশ্রয়হীনতা ও অনিশ্চিত জীবনের কঠিন বাস্তবতাই তারা উপহার পেয়েছে। এর মধ্যে এই জীবনের মধ্যেই ওরা বেঁচে আছে, বেঁচে থাকার তাগিদে।

বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে আমরা এখন একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করেছি। মানুষের সভ্যতা আজ উন্নতির প্রায় চরম শিখরে পৌঁছেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই অভাবনীয় উন্নতির যুগেও পৃথিবীর দেশে দেশে এখনও এই হতভাগ্য শিশু-কিশোররা এভাবে জীবনের ঘানী টেনে চলছে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে, আর দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের তাগিদে। তাদের এখনও খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়নি, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।

আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি মানব সভ্যতার মূল লক্ষ্যই হলো ক্ষুধা ও দারিদ্রের হাত থেকে দেশকে মুক্তি দেয়া, মানুষের জন্য মানুষের এ পৃথিবীকে সুন্দর করে গড়ে তোলা। কিন্তু এ পৃথিবীতেই যদি অসংখ্য মানব শিশু অভাবনীয় ক্ষুধা ও দারিদ্রের শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়, শুধু বেঁচে থাকার জন্যই তাদের যদি বেছে নিতে হয় এমন কঠিন শ্রমের কাজ, তাহলে এই সভ্যতার গৌরবই ম্লান হয়ে যায় না কি? দারিদ্রই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে পরাধীনতা। মানুষের জীবনে এই আহার, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান করা গেলে এমন আর কি চাওয়ার থাকে তার।

মানুষ অনুভূতিশীল জীব। সে তার ভবিষ্যতের কথা ভাবে। সন্তান-সন্ততির কথা ভাবে। সে যদি দেখতে পায় সমাজে এ অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে এবং তার সন্তান-সন্ততির জন্য আহার, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার বিধান রয়েছে, তাহলে তার এই এক জীবনে বোধহয় আর খুব বেশী কিছু চাওয়ার থাকেনা।

ভরত চন্দ্রের “অন্নদা মঙ্গলে” ইশ্বর পাটনীর মুখে তার বর প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে আমরা মানুষের এই চিরন্তন ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই- “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”। কিন্তু হতভাগ্য সমাজে আজও অসহায় পিতা-মাতার এই ক্ষুদ্র চাওয়াটুকু পূরণ হয়েছে কি?

বাংলাদেশ পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ জন লোকই দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। দেশে দারিদ্রতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ও একই পরিবারের অধিক সন্তান জন্মের ফলে পিতা-মাতা তাদের ভরণ পোষণের ব্যর্থতার জন্যই এই শিশু-কিশোর শ্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দরিদ্র পিতা-মাতা বিদ্যালয়ের আনুষাঙ্গিক ব্যয় বহন করতে না পারায় আজ তাদেরকে বিদ্যালয় ছেড়ে এই শিশু-কিশোর বয়সেই জীবিকার সন্ধ্যানে শ্রমের পথ বেছে নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা এই শিশু-কিশোরদেরকেই কাজে নিয়োগ করতে বেশি আগ্রহী। কারণ, শিশু-কিশোররা প্রতিদিন ১০ ঘন্টা থেকে ১২ ঘন্টা শ্রম দিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে। দেশে শিশু-কিশোর শ্রম বিরোধী আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই।

১৯৬৫ সালের দোকান ও প্রতিষ্ঠান আইনের ২২নং ধারায় বলা হয়েছে, ১২ বছরের নিচে কোন শিশু-কিশোরকে কোন রকম প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা যাবে না। ১৯৩২ সালের শিশু-কিশোর নিয়োগ আইনের ৩নং ধারায়ও শিশু-কিশোরদের নিয়োগের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারখানা আইনের ১৯৬৫ সালের ৬৬ নং ধারায় ১৪ বছরের নিচে কোন শিশু-কিশোরকে কারখানায় নিয়োগ করা যাবে না। ১৯৭৪ সালের শিশু-কিশোর শ্রম বিরোধী আইনের ৪৪ নং ধারামতে শিশু-কিশোর শ্রমিককে শোষণের অপরাধে ১ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে।

একই আইনের ৩৪ নং ধারায় বলা হয়েছে, ১৬ বছরের বেশি বয়স্ক কেউ যদি শিশু-কিশোরদের উপর দৈহিক নির্যাতন চালায় তবে তাকে ২ বছরের কারাদন্ড বা ১ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা যেতে পারে। উল্লেখিত আইনগুলোতে শাস্তির পরিমাণ বা বিধান পর্যাপ্ত নয়। আইনগুলোর সংস্কারপূর্বক তার যথাযথ প্রয়োগ করা হলে দেশে অনেক সম্ভাবনাময় মানুষ তৈরি হতো। কারণ, শিশু-কিশোররা অপরিণত বয়সে শ্রম দিয়ে তাদের কর্মদক্ষতা নষ্ট করে ফেলছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে তারা অল্প বয়সেই অকেজো হয়ে পড়ছে। এদের অনেককেই ভবিষ্যতে সমাজের বোঝা হয়ে জীবন-যাপন করতে হচ্ছে। তাই অবিলম্বে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের ভালোর জন্যই আমাদেরকে উল্লেখিত আইনগুলো সংস্কার ও কার্যকর করার জন্য দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পণা গ্রহণ করতে হবে।

সরকার শিশু-কিশোরদের সামগ্রীক অবস্থার কথা বিবেচনা করে মোট ৩৮ টি কাজকে শিশু-কিশোরদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকলেই শিশু-কিশোর। তন্মধ্যে ১৪ বছর পর্যন্ত কোন শিশু-কিশোরকে যে কোন শ্রমে বা কাজে নিয়োগ করা এবং ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিশু-কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শিশু-কিশোরকে শ্রমে নিয়োগ করলে তার জীবনই শুধু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে না তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ও ব্যাহত হয়। এই শিশু-কিশোর শ্রম বন্ধে সকলকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে।

“শিশু-কিশোর শ্রম নিষিদ্ধ” এই নীতি কথার উপর ভিত্তি করে উল্লেখিত আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে শুধু দারিদ্র-পীড়িত অভাবী শিশু-কিশোরদের পেট ভরবে না বা উন্নতি হবে না। তাদের জীবনের কঠিন বাস্তবতাই তাদের কাজ করতে বাধ্য করেছে। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই তাদের কাজ করতে হচ্ছে। সুতরাং এই মুহুর্তে নীতি কথা ও আইনের প্রয়োগের চিন্তা-ভাবনা বাদ দিয়ে তাদের জন্য এই কাজের ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায় কি-না সরকার ও সমাজের শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও সচেতন অংশের উচিত হবে তার পথ খুঁজে বের করা। ইতোমধ্যে কিছু কিছু দাতা সংস্থা এবং এনজিও এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

আর দশজন ভাগ্যবান শিশু-কিশোরের মতই এদের মধ্যেও রয়েছে অশেষ সম্ভাবনা। এদের শিক্ষার সুযোগ দিলে, ছবি আঁকার সুযোগ দিলে, খেলা-ধূলা ও গান-বাজনার সুযোগ দিলে এদের মধ্যে থেকেই বের হয়ে আসবে অনেক সম্ভাবনাময় শিশু-কিশোর। এদের এই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেয়া একান্ত প্রয়োজন। পরিবেশ ও সুযোগের অভাবে কত সম্ভাবনাময় শিশু-কিশোরের জীবন এভাবেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই।

সব শিশু-কিশোরই প্রচুর সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেয়। সঠিক পথ-নির্দেশ ও উপয্ক্তু সহযোগিতা পেলে যে কোন শিশু-কিশোরই তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারে। কর্মজীবি শিশু-কিশোররা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে শিক্ষা তার মৌলিক অধিকার। সে তার এই নাগরিক ও মানবিক অধিকার থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। আর সমাজ বঞ্চিত হচ্ছে মেধা ও দক্ষতা থেকে। দেশের এই বিশাল জনশক্তি যদি এভাবে অপচয় হয়, তাহলে তা কোন দেশ বা জাতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ কোন চিন্তা-ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এ ক্ষেত্রে যতটুকু সাহায্য সহযোগিতার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য/অপ্রতুল। সামাজিক সংগঠনগুলো তথা এনজিও এবং সরকার এ ক্ষেত্রে আরও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজকল্যাণমূলক চিন্তা-ভাবনা, সামাজিক হিতাকাঙ্খা কেবল কথায় সীমাবদ্ধ না রেখে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিৎ যাতে সত্যিকার অর্থেই শিশু শ্রম নিরসন যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here