বসন্ত উৎসব : ইতিহাস ও করণীয় – দ্যা মেইল বিডি / খবর সবসময়
ছবি ঘরপাঁচমিশালিবাংলাদেশসারা বাংলা

বসন্ত উৎসব : ইতিহাস ও করণীয়

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

ষড়ঋতুর বাংলাদেশ। ফাল্গুন ও চৈত্র এ দু’মাস বসন্ত কাল। বসন্ত আসে আবেগঘন ও বর্ণিল আনন্দবার্তা নিয়ে আপন মহিমায়। ঋতুর পরিবর্তনে গাছের কচি ডালে নতুন পত্রপল্লব হয়ে ওঠে সুশোভিত। সুরভিত সমীরণে গানের পাখি কোকিলের মনকাড়া মধুর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সুমধুর গান। আম্রকাননে কোকিলের কুহু কুহু সমধুর সুরে সব ঘুমন্ত হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। এ ঋতুতে গানের পাখি ‘বউ কথা কও’ এর সমধুর সুর তোলে। তাছাড়া গানের পাখির মৌ মৌ গানে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রকৃতি।

বসন্ত মানে অজস্র ফুলের সমারোহ। হাজার রঙের মিলন মেলা। প্রকৃতিতে বসন্ত ছুঁয়ে যাওয়ার কিছু আগেই এ ঋতুর কিছু ফুল শুভেচ্ছাদূত হয়ে হাজির হয়। ফাল্গুন ফুলের মাস। ফুল ফোটার মাস। কবি বলেছেন, ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক এখন যে বসন্ত’…। সময়টা যে ফুলের সৌরভে সুরভিত। তাই এ ঋতুতে দেশব্যাপী ফুলের সুরভিত শীতল সমীরণে ঢেউ তুলে।

পুষ্প কাননে জুই, চামেলী, রজনীগন্ধ্যা, শিমুল, হাসনাহেনা, গোলাপ, কৃষ্ণচূড়ার সবুজ ডালে শোভাবর্ধন করে রক্তের মতো লাল ফুল। বসন্ত কাল মানে মহাশান্তি বা প্রশান্তির কাল। এ ঋতু প্রশান্তির মহাডালি নিয়ে হাজির হয়। প্রশান্তি মানে, না আছে শীত আর না আছে গরম।

বাংলার প্রবাহমান নদীর স্রোতের মতো বসন্তের উল্লাস সবার জীবনে প্রবাহিত হয়ে থাকে। ফাল্গুন মাস এলে-যুগ যুগান্তরে হরেক রকম পাখি, গোধূলিময় পৃথিবী ক্রমে শীতল ছায়া, অজস্র রোদের অচিন্তনীয় বিস্তারে প্রাণ ভরে ওঠে। তাই বসন্তের অপরূপ সৌন্দর্যে, সুরভিত ঘ্রাণে ভরে উঠে সবার হৃদয় প্রাণ। সাধারণত প্রতি বছর পহেলা ফাল্গুন হয়ে আসছিল ইংরেজি ১৩ ফেব্রুয়ারি। গত বছর বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধন করেছে সরকার। সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এ বছর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন পালন হচ্ছে।

এ দিনটিতে প্রকৃতির সাথে সাথে বাসন্তি সাজে সেজে ওঠে বাংলার মানুষেরা। আর শুধু এই বাংলাই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খ- ও উড়িষ্যাসহ অন্যান্য রাজ্যেও দিনটি বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কবে কীভাবে এসেছে, এত ঘটা করে বসন্ত উৎসব পালনের রেওয়াজ? ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আর্য জাতির হাত ধরে এই উৎসবের জন্ম। খ্রিস্টের জন্মেরও বেশ কয়েকশো বছর আগে থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে এই উৎসবটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে পাথরের উপর খোদাই করা এক পাথরে পাওয়া গেছে এই উৎসবের নমুনা।

দোলযাত্রার বৈষ্ণব বিশ্বাস
এখন যে দোল উৎসব পালিত হয়, এর নেপথ্যে রয়েছে বৈষ্ণব ধর্মালম্বীদের কিছু আদি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের অন্যতম হলো, দোলপূর্ণিমার (ফাল্গুনী পূর্ণিমার অপর নাম) দিনে বৃন্দাবনে আবির ও গুলাল নিয়ে রাধা ও অন্যান্য গোপীদের সাথে রং ছোঁড়াছুড়ির খেলার মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। আর সে কারণেই কি না, এখন দোলপূর্ণিমার দিন রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তিকে আবির-গুলালে স্নাত করিয়ে, দোলনায় চড়িয়ে বের করা হয় শোভাযাত্রা। আর সেই সাথে চলতে থাকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। এই শোভাযাত্রা শেষ হলে, ভক্তেরা এবার নিজেরাও পরস্পরের গায়ে রং মাখানোর খেলায় মেতে ওঠেন।

বাংলায় যেভাবে এলো বসন্ত উৎসব
পুরীতে ফাল্গুন মাসে যে দোলোৎসব হতো, তার অনুকরণে বাংলাতেও প্রবর্তিত হয় এই উৎসব পালনের রেওয়াজ। বাংলায় বসন্তকালে রাসমেলা বা রাসযাত্রারও প্রচলন হয় মধ্যযুগে। নবদ্বীপ, যেটি মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যদেবের জন্য খ্যাত, সেখান থেকেই রাসমেলার উৎপত্তি। বসন্তকালে বাংলাদেশের খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে রাসমেলা হয়ে থাকে। সেখানে কীর্তনগান ও নাচের আসর বসে থাকে। এছাড়া প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ফাল্গুনী পূর্ণিমা উদযাপনের মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নিত।

১৫৮৫ সালে স¤্রাট আকবর বাংলা বর্ষপঞ্জী হিসেবে আকবরি সন বা ফসলী সনের প্রবর্তন করেন। একইসাথে প্রবর্তিত হয় প্রতি বছর ১৪টি উৎসব পালনের রীতিও। এর মধ্যেই অন্যতম ছিল বসন্ত উৎসব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত বরণ উৎসবের ইতিহাস
আজ যে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে বসন্তের প্রথম দিন তথা পহেলা ফাল্গুন অন্যতম বৃহৎ সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এর পেছনে অবদান রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের একদল শিক্ষার্থীর। ১৯৯১ সালে কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই বসন্ত বরণ উৎসব পালন করেছিল তারা। সেবার পহেলা ফাল্গুনের আগের দিন চারুকলা অনুষদের কিছু মেয়ে শাড়ি কিনে মৈত্রী হলে রাতের বেলা ব্লক প্রিন্ট করে। পরদিন তারা ওই শাড়ি পরে নিজেদের অনুষদে হাজির হয়। বরাবরের মতোই অদূরে বাংলা একাডেমিতে চলছিল অমর একুশে বইমেলা, যা তাদের মাঝে যোগ করে অতিরিক্ত উৎসবের উন্মাদনা।

আনুষ্ঠানিক বসন্ত বরণ উদযাপনের সূচনা
শুরুটা চারুকলার শিক্ষার্থীদের হাত ধরে হলেও, দ্রুতই বসন্ত বরণের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অনুষদের শিক্ষার্থীরাও। তাই ১৯৯৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত উৎসব উদযাপন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ
বসন্ত উৎসব পালনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা বলতে পারি, এটা বাঙ্গালী সংস্কৃতির কোন অংশ নয়। তাছাড়া এ উৎসবে যে সকল অনুষ্ঠান পালন করা হয় তার অনেক কিছুই মূর্তি পূজা ও প্রকৃতি পূজারীদের আচার-অনুষ্ঠানের সাথে মিলে যায়। তাই তা পালন করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদে মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন, ‘‘আর যারা মিথ্যার সাক্ষ্য হয় না।’’ [সূরা ফুরকান, আয়াত : ৭২]

তাফসিরে ইবনে কাসিরে এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘‘আবুল আলিয়া, তাউস, ইবনে সিরিন, যাহহাক, রবি ইবনে আনাসসহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ বলেন, সেটা হল বিধর্মীদের উৎসবের দিন।’’ [তাফসিরে ইবনে কাসির ৫/৬১৪]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘হযরত ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি যার সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’’ [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ৪০৩১]

সমাজে যেভাবে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে- তা যদি বন্ধ করা না যায়। তাহলে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। যেমনটি মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, “যারা মু’মিনগণের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে পীড়াদায়ক শাস্তি। মহান আল্লাহ সবই জানেন। আর তোমরা জানো না।” [সূরা আন নূর : ১৯]

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিজাতীয় সংস্কৃতি রোধ এবং ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমের জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

Show More

এই বিভাগের আর খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close